ইব্রাহিম খলিল বাদল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখে আর মাত্র ১৮ দিন বাকি। নির্বাচনি মাঠে প্রধান দুই শক্তি—বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট—দিন দিন মুখোমুখি অবস্থানে এসে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনের সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। এই ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ভারসাম্য উল্টে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক: ‘তুরুপের তাস’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও নির্বাচন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে আওয়ামী লীগ সরাসরি অংশগ্রহণ করছে না, তাদের বিশাল ভোটব্যাংক তবুও নির্বাচনের দিক নির্ধারণে প্রভাবশালী। সিদ্ধান্তহীন ভোটারের একটি বড় অংশ মূলত এই ভোটব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত।
জাতীয় নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতি অতীতে একেবারেই পরিবর্তনশীল: কখনও ৪০ শতাংশের নিচে, আবার কখনও ৮৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় মাত্র ১০ শতাংশ ভোটই জয়পরাজয়ের নিয়ামক হতে পারে। ফলে ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো, এই ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানিয়ে আনা।
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ও জামায়াতের জোট স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের কাছে পৌঁছাতে মরিয়া। কুমিল্লা, ভোলা, চুয়াডাঙ্গা ও ময়মনসিংহে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ সমর্থক বিএনপি ও জামায়াতের শিবিরে যোগদান করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপি ও জামায়াত প্রকাশ্যভাবে এই ভোটারদের নিজেদের বাক্সে আনার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জরিপ ও ভোটের গতিপথ
বিভিন্ন জনমত জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
-
ইনোভিশন কনসালটিং (সেপ্টেম্বর ২০২৫): আওয়ামী লীগের সমর্থন ১৮.৮০ শতাংশ।
-
এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (৫ জানুয়ারি ২০২৬): প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে, ১৯ শতাংশ জামায়াতকে এবং ২.৬ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দিতে চায়। আওয়ামী লীগের ভোটারের ৬০ শতাংশ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
-
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (১২ জানুয়ারি ২০২৬): ৩৪.৭% ভোটার বিএনপি, ৩৩.৬% জামায়াত, ৭.১% এনসিপি, ৩.১% ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ভোট দিতে চায়। ১৭% ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, জাতীয় নির্বাচনে পাঁচ-দশটি ভোটের পার্থক্যও জয়পরাজয় নির্ধারণ করতে পারে। তাই ১৭ শতাংশ সিদ্ধান্তহীন ভোটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা হয়তো ভোট না দেবেন, বা বিকল্প প্রার্থীকে ভোট দেবেন। বিশেষ করে কট্টর আওয়ামী সমর্থকদের ভোটদানে বিরত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে। কোন দল বা প্রার্থী এই ভোট পাবে তা নির্ভর করবে স্থানীয় রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর। যারা তাদের আশ্রয়প্রশ্রয় দিয়েছে বা নিরাপদ পরিবেশে থাকতে সাহায্য করেছে, সেই দল বা প্রার্থীকেই ভোট দেবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পরাজয় নির্ধারণের মূল কৌশলগুলো হচ্ছে:
-
সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের আকর্ষণ: ভোটের রূপান্তর নির্ভর করছে মূলত এই ভোটারদের ওপর।
-
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিয়ন্ত্রণ: তাদের অনুপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এই ভোটব্যাংক নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে।
-
নিরাপত্তা ও স্থানীয় রাজনীতি: ভোটাররা কোন দলের পাশে যাবে তা নির্ভর করছে ভোটারদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় স্তরে দলের আচরণের ওপর।
-
ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রভাব: এই ভোটাররা নির্বাচনের ফলকে অপ্রত্যাশিত দিকেও ঘুরিয়ে দিতে পারে।
নির্বাচন ঘিরে প্রতিটি দল কৌশল নিয়েছে—কেউ ভোটারকে আকৃষ্ট করতে, কেউ কৌশলগত প্রতিশ্রুতি দিয়ে, আবার কেউ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে। ফলাফল শুধুমাত্র ভোটের সংখ্যার ওপর নয়, বরং ভোটার মনোভাব ও রাজনৈতিক আচরণের ওপরও নির্ভর করবে।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


