ইব্রাহিম খলিল বাদল

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্মিতব্য বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বিএসইজেড) প্রকল্পটি মাঝপথে এসে গুরুতর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বিদেশি অর্থায়নকারী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ঋণচুক্তি থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ৩০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জাইকা জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
জাইকার অভিযোগ কী
জাইকার চিঠিতে মূলত দুটি শর্ত পূরণ না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ভূমি হারানো মানুষদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। জাইকার মতে, একাধিক বৈঠক ও বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও বেজা এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি।
চিঠিতে আরও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, জাইকার গাইডলাইন অনুযায়ী যেকোনো ঋণ প্রকল্পে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। অথচ আড়াইহাজার প্রকল্পে সেই মানদণ্ড অনুসরণে ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।
বারবার সতর্কবার্তা, শেষ পর্যন্ত হুমকি
সূত্র জানায়, জাইকা এর আগেও গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে একই বিষয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিল। তবে সেসব সতর্কবার্তার পরও কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় সর্বশেষ ডিসেম্বরের চিঠিতে সরাসরি অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়। এতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ নিয়ে জটিলতা
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার বিষয়ে জাইকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দায়ী করলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসকের ছাড়পত্র পাওয়ার পরই অর্থ ছাড় করা হয়। ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলা-মোকাদ্দমা ও কাগজপত্রের জটিলতার কারণেই মূলত বিলম্ব হচ্ছে। এসব নিষ্পত্তি না করে অর্থ ছাড় করলে সরকারের ওপর অপ্রয়োজনীয় সুদের বোঝা তৈরি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি প্রকল্প
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে একনেকে অনুমোদনের সময় চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাইকার ঋণ ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা এবং বাকি ৪৫৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা।
কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবুও কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে বেজা। একই সঙ্গে সরকারি তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
বড় স্বপ্ন, বাস্তবায়নে ধীরগতি
এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ৩০০টিরও বেশি জাপানি কোম্পানির জন্য আধুনিক শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। দেশের প্রথম সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে এটিকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত।
কী হতে পারে পরিণতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাইকা যদি সত্যিই অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, তবে শুধু আড়াইহাজার প্রকল্পই নয়—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদেশি উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে এটি একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে যে, বড় প্রকল্পে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।
সব মিলিয়ে, আড়াইহাজারের জাপানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাইকার শর্ত পূরণে সরকার ও বেজা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প অনিশ্চয়তার অন্ধকারেই তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইব্রাহিম খলিল বাদল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ হ্উিম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


