
মানুষের বিভিন্ন প্রকার ভাষা আছে। মুখের ভাষা, চোখের ভাষা, মনের ভাষা, শারীরিক ভাষা, ব্যক্ত ভাষা, অব্যক্ত ভাষা, বাংলা ভাষা, উর্দু ভাষা, ইংরেজী ভাষা ইত্যাদি। তবে সবই মা ও মানুষের ভাষা। আদিমকালে হাততালি, বিভিন্ন শব্দ ও অঙ্গভঙ্গি করার মধ্য দিয়েই মানুষ তাঁদের মনের “ভাব” বিনময় করত। এ থেকেই ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।
মানুষের মত পশু-পাখি ও বিভিন্ন ঘটনারও বিভিন্ন ভাষা এবং ঘটনার অন্তরালের কিছু অব্যক্ত ঘটনা থাকে। এর মধ্যে অনেক কিছু আক্ষরিক ভাষায় প্রকাশ করা হয় আবার অনেক কিছু অপ্রকাশ এবং অব্যক্ত থেকে যায়। পাকিস্তানী শাসকরা কেন আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তা বোধগম্য নয়। তারা কি উর্দু ভাষা শিক্ষা দিয়ে আমাদেরকে উর্দুভাষী সম্প্রদায়ভুক্ত করতে চেয়েছিল? রাষ্ট্রীয় শাসন-শোষনের বিষয়গুলো সাধারণত: রাজনৈতিক হয়ে থাকে। রাষ্ট্রভাষা উর্দু করলেই রাতারাতি বাঙালিরা উর্দুভাষী হয়ে যেত, এমনটা ভাবার কোনো কারণ ছিল না! মূলত: ভাষা সাম্প্রদায়িকতার অন্ধ উন্মাষিকতার উন্মাদনা থেকেই উর্দুভাষী পাকিস্তানী শাসকরা রাষ্ট্রভাষা উর্দু করে আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে অপপ্রয়াস চালিয়েছিল! যদি পাকিস্তানীদের মধ্যে মহানবী রসুলে করিম (স) এর মত মানবতাবাদী চেতনা বিদ্যমান থাকত তাহলে তারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়ার অদ্ভুত চিন্তা করত না।
ইংরেজী ভাষাও ইংরেজদের মাতৃভাষা। বিশ্বের সব ভাষাই মাতৃভাষা। এখানে ইংরেজী, বাংলা কিংবা উর্দু বলে কোনো কথা নেই। পৃথিবীতে উর্দুভাষী পাকিস্তানীদের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জাতির উপর অন্যকোন ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। ১৯৫২ সালে একমাত্র বাংলা ভাষার উপর উর্দুভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবীতে কোনো জাতিকে তাঁদের মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়নি। একমাত্র বাংলাভাষী সম্প্রদায় আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলা’র জন্য বুকের তাজা রক্তে রাজপথ পিচ্ছিল করে দিয়েছিলাম। এ জন্যই সারা বিশ্বের মায়েরা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে নিজেদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ কারণেই বাংলা ভাষা আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতিলাভ করেছে।
আমরা আন্তর্জাতিক এই মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী বিকশিত না করে নিজেদের বগলতলা করে রাখতে চাই! এ ধরনের মানসিকতা থেকে আমরা অনেকেই অন্যান্য মাতৃভাষাকে অশ্রদ্ধা করি। আমরা যদি অন্য ভাষাকে অশ্রদ্ধা করি, তাহলে তারাও আমাদের ভাষাকে অশ্রদ্ধা করবে। এতে মানুষে-মানুষে বিভেদ-বিভক্তি পাকাপোক্ত হয়। অন্যান্য মাতৃভাষার দু’একটি শব্দ যদি আমরা ব্যবহার করি তাহলে সেটা বায়ূদূষণের মত ক্ষতিকর বলে অনেকে আখ্যায়িত করেন।
এক সময় আলেম সমাজ ইংরেজী ভাষা শিক্ষাকে ‘না জায়েজ’ বলে ফাতওয়া দিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের তৈরি জীবনরক্ষাকারী ঔষধ সেবন করে নিজেদের জীবনরক্ষা করতে তারা লজ্জাবোধ করেননি। কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের কবিতা ইংরেজী ভাষায় কাব্য করে ‘নোবেল প্রাইজ’ লাভ করেছিলেন। তিনি ইংরেজী ভাষাকে কখনো অশ্রদ্ধা করেননি। ইংরেজী ভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে আমাদের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের আন্দোলন হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে হাইকোর্ট অনেক আগেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের জন্য আদেশ জারি করেছেন। কিন্তু হাইকোর্টের ওই আদেশ বাস্তবে রূপ নেয়নি।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হওয়ার বিষয়টি সম্ভবত আইনী নয়। এটি বাঙালি জাতির উন্নত সুখী-সমৃদ্ধ জীবন গঠনে বাংলা ভাষার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়। উন্নত জীবন গঠন করতে হলে উন্নত ও সম্মানজনক পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিচারিক (ব্যারিষ্টারী), প্রশাসনিক, স্থাপত্ত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, এটমিক গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সর্বাগ্রে সেটা দেখতে হবে। পেশাগত এসব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চাহিদা এবং গুরুত্ব সৃষ্টি করতে হবে। যখন এসব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চাহিদা ও গুরুত্ব সৃষ্টি হবে তখন আইনের প্রয়োজন হবে না, এমনিতেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে।
ভাষার মিশ্র ব্যবহারের অপকারিতা সম্পর্কে বিজ্ঞজনেরা বিশেষ উষ্মা প্রকাশ করেন। ব্যবহারিক বাংলা ভাষার মধ্যে ভাষার মিশ্রনের বিষয়টি দোষের কিছু নয়। আরবি কুরআন মজিদও ভাষা মিশ্রনের বাইরে নয়। কুরআন মজিদে আরবি শব্দ ছাড়াও বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুরা ফাতিহার শেষ ‘আমিন’ শব্দটি আরবি নয়, এটি ‘হিব্রু’ শব্দ। এতে কুরআন মজিদের কোনো ক্ষতি হয়নি, কিংবা কুরআন পাঠে বা অর্থকরণেও কোনো ব্যতায় ঘটেনি।
এছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। তাঁদের প্রধান ধর্মীয় অনুশীলন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এ নামাজ অনুশীলনে কোনো বাংলা বাক্য ব্যবহার করা হয় না। নামাজ অনুশীলনে বাংলা ব্যবহার না হওয়ার কারণে নামাজে কোনো ব্যতায় ঘটে বলে মনে হয় না। এছাড়া ‘হাই কোর্ট’‘ জজ কোর্ট’ অমর একুশে ‘ফেব্রুয়ারী’ বাংলা ‘একাডেমী’ এসব শব্দ বাংলা নয়, কিন্তু এসব শব্দ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এতে কোনো প্রকার সমস্যা দেখা দেয়নি। মিশ্রন নেই, বিশ্বে এমন কোনো ভাষা প্রচলিত নেই।
আমাদের বুঝতে হবে এবং জানতে হবে যে, ভাষার মূল ক্রীয়া এবং প্রয়োজনীয়তা কি? ভাষার মূল ক্রীয়া এবং প্রয়োজনীয়তা হলো, মানুষের মনের “ভাব ও মত” বিনিময় করা। এটা যে কোনো ভাষা এবং অক্ষর ব্যবহারের মাধ্যমে হতে পারে, এতে দোষের কিছু নেই। বিশ্বের সকল ভাষাই মাতৃভাষা। ভাষার মধ্যে কোনো বিভিন্নতা নেই, সকল ভাষা এক ও অভিন্ন! বিভিন্নতা যা রয়েছে, তা হলো, বিভিন্ন ধরনের ‘অক্ষর’ এবং বিভিন্ন ‘শব্দ’ কিংবা বাক্য উচ্চারণ ও ব্যবহারে। কিন্তু ভাষা ও অক্ষরের মূল ক্রীয়া এক ও অভিন্ন।
যদি আমি নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দেই তাহলে আমি বাঙালি সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে পড়ি। বাঙালি জাতিও একটি সম্প্রদায়। সম্প্রদায়ের অন্তরেই সাম্প্রদায়িকতা সুপ্তাবস্থায় গুপ্ত থাকে। সুপ্ত থাকা এ সাম্প্রদায়িকতা কখন যে ঘুমন্ত সাপের মত জেগে ছোবল মারবে তা কেউ জানে না। কিন্তু আমি যদি নিজেকে বিশ্বমানব জাতির সদস্য বলে মনে করি এবং বিশ্ব মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী হই, তাহলে সম্প্রদায় কিংবা সাম্প্রদায়িকতা বলতে কিছু থাকে না। ভাষা সাম্প্রদায়িকতা হলো, বিশ্বমানব জাতির জন্য অভিশপ্ত একটি ভয়্কংর চেতনা। বিশ্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এই সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ঘটেছে।
সুতরাং আমাদের এই পবিত্র অমর একুশে ফেব্রুয়ারীতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস উদযাপন উপলক্ষে বাংলা ভাষার জন্য যে সকল ভাই ও বোনেরা জীবন দিয়েছেন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। অমর একুশে ফেব্রুয়ারীতে বিকশিত হোক ‘বিশ্ব মানবতা’, নির্মূল হোক অসভ্য সাম্প্রদায়িকতা, জাগ্রত হোক অসাম্প্রদায়িক ‘বিশ্ব মানবতাবাদী’ চেতনা এবং প্রজ্জ্বলিত হোক বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ মানবতাবাদী চেতনা।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


