সুফি সাগর সামস্

ঢাকা–গাজীপুর করিডোরে নির্মাণাধীন বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি আজ পরিণত হয়েছে এক গভীর প্রশাসনিক ও কারিগরি সংকটে। এক দশকের বেশি সময়, পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় এবং অগণিত ভোগান্তির পরও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। চালু করাও কঠিন, ভেঙে ফেলাও প্রায় অসম্ভব—এই দ্বন্দ্বের মাঝেই দায়ভার ঠেলে দেওয়া হচ্ছে পরবর্তী সরকারের কাঁধে।
সময়ের হিসাব: শুরু থেকে জটিলতায়
২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া বিআরটি প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। এরপর একের পর এক দুর্ঘটনা, ধীরগতি ও নকশা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি পিছোতে থাকে বছরের পর বছর।
- প্রাথমিক ব্যয়: ২,০৩৮ কোটি টাকা
- সংশোধিত ব্যয়: ৪,২৮৬ কোটি টাকা
- ইতোমধ্যে ব্যয়: প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা
চতুর্থ দফায় আরও প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব সম্প্রতি একনেক সভায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
ভুল নকশার স্বীকারোক্তি
বুয়েটের অধ্যাপক ও প্রকল্পের সাবেক পরামর্শক ড. সায়ের গফুর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন,
“এই প্রকল্পটি ছিল পুরোপুরি একটি ভুল পরিকল্পনা, ভুল নকশা এবং ভুল সিদ্ধান্তের ফল। দীর্ঘদিন সময় ও বিপুল অর্থ অপচয় হয়ে এটি এখন একটি বিরাট জঞ্জালে পরিণত হয়েছে।”
একনেক প্রকল্পের নকশাকে ‘বিকট ও অপরিকল্পিত’ আখ্যা দিয়ে নকশা ও বাস্তবায়নের ত্রুটি তদন্তের নির্দেশ দেয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে গঠিত একাধিক কমিটিও কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
ভাঙলেও লাভ নেই
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের মতে, প্রকল্পটি ভেঙে ফেলতে হলে অতিরিক্ত ২,০০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। অথচ ভেঙে ফেললেও টেকসই কোনো সমাধান মিলবে না।
তার ভাষায়, পুরো করিডোর এখন এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যার সমাধান ‘অত্যন্ত জটিল’। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরাও এখনো কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প মডেল দিতে পারেননি।
সরেজমিনে: অব্যবস্থাপনার নগ্ন চিত্র
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে ঘুরে দেখা গেছে—
- অসমাপ্ত স্টেশন, এস্কেলেটর ও লিফট বছরের পর বছর পড়ে আছে।
- যাত্রীছাউনি ও সিঁড়ি নির্মাণ শেষ না হওয়ায় রাস্তার মাঝখানের বড় অংশ অব্যবহৃত।
- অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ অপসারণ হওয়ায় পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন।
- নির্মাণসামগ্রী চুরি ও নষ্ট হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে।
ফলে এই মহাসড়কে নিত্যদিনের যানজটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
প্রশাসনিক অচলাবস্থা
গত অক্টোবরে সীমিত ব্যয়ের মধ্যে কেবল জরুরি কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আর অনুমোদন পায়নি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না।
ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন খান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, এটি এখন সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকল্প।
একনেকের সুপারিশে দায় নির্ধারণে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত—
- কোনো চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ হয়নি
- কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়
এই নীরবতা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতিকেই স্পষ্ট করে।
বিশ্লেষণ
এই প্রকল্পের ব্যর্থতার পেছনে প্রধান কারণগুলো—
- বাস্তবতাবিবর্জিত ও অপরিকল্পিত নকশা
- দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা
- রাজনৈতিক ও بيرোক্রেটিক চাপ
- কারিগরি পর্যালোচনার ঘাটতি
- জবাবদিহিতার অভাব
বিআরটি এখন একটি典型 ‘সাঙ্ক কস্ট ট্র্যাপ’—যেখানে অতীতের ভুলের বোঝা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
সামনে পথ কোনটি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরবর্তী সরকারের সামনে তিনটি কঠিন বিকল্প—
- স্বাধীন আন্তর্জাতিক কারিগরি অডিটের মাধ্যমে নিরাপত্তা নির্ধারণ
- আংশিক পুনর্নকশা ও অন্য পরিবহন করিডোরে রূপান্তর
- দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা
এর বাইরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ফুটওভার ব্রিজ, অস্থায়ী পারাপার ও ট্রাফিক পুনর্বিন্যাস জরুরি।
বিআরটি প্রকল্প এখন আর কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রতীক। বাতিল করেও সমাধান নেই, চালু করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, পেশাদার কারিগরি সিদ্ধান্ত এবং সর্বোপরি কঠোর জবাবদিহিতা।
এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এখন পরবর্তী সরকারের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


