
ভারত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে ‘নিরাপত্তার রক্ষাকর্তা’ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বাভাবিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। নেহরুর সময় থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত ভারতের কূটনীতির একটি মূল রূপরেখা হলো—প্রতিবেশীদের ওপর প্রভাব বজায় রাখা, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করা।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কৌশল উল্টো ভারতের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। নানা ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ, চাপ প্রয়োগের কৌশল এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছোট দেশগুলোর জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রচেষ্টা
ভারত কয়েকটি বড় লক্ষ্য সামনে রেখে অঞ্চলকে নেতৃত্ব দিতে চায়—
-
সন্ত্রাস দমন,
-
সামুদ্রিক নিরাপত্তা,
-
অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো,
-
চীনের বিকল্প কৌশলগত কেন্দ্র সৃষ্টি।
এই লক্ষ্যগুলো কাগজে-কলমে শান্তিপূর্ণ শোনালেও বাস্তবে ভারত অনেক সময় কঠোর ও বিতর্কিত পদক্ষেপ ব্যবহার করেছে।
একতরফা ও চাপসৃষ্টিকারী পদক্ষেপ
যে কিছু ঘটনা আঞ্চলিক অস্বস্তি বাড়িয়েছে—
-
পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত—দুই দেশের দীর্ঘদিনের জলবণ্টন কাঠামো ভেঙে দেওয়ার হুমকি।
-
নেপালের ওপর ২০১৫ সালের অর্থনৈতিক অবরোধ—সরকারি পর্যায়ে না বললেও সব মহলে স্বীকৃত যে ভারত এই অবরোধে ভূমিকা রেখেছিল।
-
মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার—সরকার পরিবর্তনে চাপ, নিরাপত্তা চুক্তিতে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি।
-
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য পক্ষপাত—বিগত দশকে বিভিন্ন নির্বাচনে নয়াদিল্লির ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে।
এই পদক্ষেপগুলো ভারতকে আঞ্চলিক নেতা নয়, বরং আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করছে।
বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্যবাদের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সমর্থন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—ভারতকে বাংলাদেশে একটি বিশেষ অবস্থান এনে দিয়েছিল। সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্য—সবকিছুতেই ভারত প্রভাব রাখত।
সম্পর্কের নাটকীয় ভাঙন
২০২৪ সালে এক ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারালে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ধারা ভেঙে পড়ে।
ঘটনার সময় ভারত—
-
বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ করে,
-
কূটনৈতিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়,
-
এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়।
বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিতে এটি ছিল—জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান নেওয়া। পরে আন্দোলন চলাকালে হত্যা-নির্যাতনকাণ্ডে দায় নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
সাধারণ মানুষের ভাবনা
বাংলাদেশে ভারতের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে। ছাত্র-যুবসমাজসহ অনেকেই মনে করে—ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথে বাধা দিয়েছে।
‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে প্রকাশ্য স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ভারতই ভূমিকা রেখেছে। এই কারণে তিন দেশেই ভারতবিরোধী মনোভাব ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
ভারত যে সরকারগুলোকে সমর্থন করেছে সেগুলোর অনেকগুলোই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এতে সাধারণ মানুষের চোখে ভারত হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি, আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র । চীনের মতো বিকল্প শক্তির প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।
‘ভারত-বিরোধিতা’ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ ও জনমতের প্রবণতা—
-
বাংলাদেশ: ২০২৪-এর পর ভারতবিরোধী জনপ্রবাহ অভূতপূর্ব।
-
শ্রীলঙ্কা: অর্থনৈতিক সংকটকালে ভারতের ঋণ ও শর্ত নিয়ে অসন্তোষ।
-
মালদ্বীপ: “India Out” আন্দোলন জনমতের শক্ত ধারা হয়ে উঠে।
-
নেপাল: সীমান্ত ও সংবিধান নিয়ে ভারতীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ বহুবার উত্তপ্ত করেছে পরিস্থিতি।
এগুলো ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নেতৃত্বের সংকট ও আগামীর পথ
ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে—
-
ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে,
-
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে,
-
অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সমমর্যাদায় পুনর্গঠন করতে হবে,
-
আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে (যেমন সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের অনেক কৌশল উল্টো আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে বাধা তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রতিবেশীদের আস্থার পুনর্নির্মাণের ওপর।
সুফি সাগর সামস
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


