সুফি সাগর সামস্

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) গণভোটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী প্রথা এবং নির্বাচিত সরকারের মডেল প্রবর্তন করেছিলেন। বিশ্ব ইতিহাসে এটিই গণতন্ত্রের প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক যুগেও বিশ্বে নির্বাচিত সরকারের বিকল্প এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। যদিও ত্রুটি ও অসন্তুষ্টি থাকলেও গণতন্ত্রের বিকল্পের অনাবিষ্কার একটি বাস্তবতা, যা আমাদের ভাবনার উদ্রেক করে। একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র, অলিগার্কি বা একদলীয় শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্রের বিকল্প হলেও, সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচনের ইতিহাস কখনো একরকম হয়নি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নানা ত্রুটি, দখলবাজি ও বিকৃত ফলাফলের মধ্য দিয়ে নির্বাচন পরিচালিত হলেও, ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথমবার স্বাধীন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের রূপ দান করে। সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকা থাকলেও, সেই নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ নেপথ্য-সামরিক হস্তক্ষেপবিহীন এবং জনগণের অংশগ্রহণমুখী। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এর পরের নির্বাচনগুলোর মধ্যে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কিছুটা ধারাবাহিকতা দেখা গেলেও, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশ বিশেষভাবে ভোট ও নির্বাচনের দিক থেকে প্রহসন ও বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৪ সালে বিনা ভোটে এমপিদের ঘোষণা, ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতের ফলাফল, এবং ২০২৪ সালে ‘আমি-ডামি’ মডেল—এইসব কৌশল দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব ঘটনায় জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তবে আজকের বাংলাদেশে আমরা এমন একটি প্রেক্ষাপটের মুখোমুখি যেখানে জনগণ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান—সরকার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী—সহমতবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যেই সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়েছেন। এই উদ্যোগ দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণ। নির্বাচন শুধু সরকারি কর্তৃপক্ষ বা সেনাবাহিনীর দায়িত্বের বিষয় নয়; এটি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মধ্যেই সফল হয়। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও শত্রু নয়; তাদের দায়িত্ব হলো ভোট ও নির্বাচনের মর্যাদা রক্ষা করা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা।
বাংলাদেশের দীর্ঘ নির্বাচনী ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে, ভোট এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ স্বাধীনতা, ন্যায্যতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসন নিশ্চিত করতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু আইন ও প্রশাসনের নয়, জনগণের সচেতনতা, রাজনৈতিক দায়িত্ব ও সহমতেও নির্ভর করে।
আজকের দিনে আমরা আশা করি, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে ইতিহাস সৃষ্টি করতে সক্ষম। এটি হবে সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, এবং দেশবাসীর প্রত্যাশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ভোটের শক্তি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে পারি।
গণতন্ত্র ও সুশাসন ছাড়া উন্নত বাংলাদেশের বিকল্প নেই। দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রতিটি ভোট ও অংশগ্রহণই সেই বিকল্পের পথকে দৃঢ় করে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


