বিশেষ প্রতিবেদক

ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশের জনগণ আশা করেছিল নতুন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহি ভিত্তিক প্রশাসন গড়ে উঠবে।
কিন্তু প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য জনসম্মুখে আসে নি। এই ব্যর্থতা ঘিরে সম্প্রতি বিবিসি বাংলা অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নানা অভিযোগ ও বিশ্লেষণ।
জনগণের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সময়কালে একের পর এক দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটবে। অধ্যাপক ইউনূসের সরকার এই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা অনেকটা ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে। উপদেষ্টা, তাদের পরিবার ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেছেন, “যারা জবাবদিহির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের অস্বচ্ছ কর্মকাণ্ড দেশবাসী প্রত্যাশা করেনি।”
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করা আগামী দিনের রাজনৈতিক সরকারের জন্য খারাপ উদাহরণ তৈরি করছে। প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের আচরণ অনেকাংশে সাবেক সরকারের মতোই।”
অভিযোগ ও প্রমাণ
গত বছরের আগস্টে সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার ‘সীমাহীন দুর্নীতি’র অভিযোগ তোলেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টা সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে, কিন্তু তা তদন্তে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
একইভাবে, সজীব ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবীসহ একাধিক কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত প্রক্রিয়ায় গত ১০ মাসে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা ও বিতর্ক
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা সুযোগ-সুবিধা পায়। এ নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা ও প্রশ্নও উঠেছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, “যদি প্রধান উপদেষ্টার হাতেও মন্ত্রিপরিষদ বা প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের মতো প্রভাব বিস্তার দেখা যায়, তাহলে পরিবর্তনের কোন নমুনা এখানে দেখা যাচ্ছে?”
তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেন, “গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূস কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করেননি।”
পর্যালোচনা ও সুপারিশ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপদেষ্টারা সম্ভবত সম্পদিক কারণে তাদের তথ্য প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “যদি তারা সত্যিই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়, তবে এখনও সময় আছে। ক্ষমতা ছাড়ার সময় তাদের সম্পদ প্রকাশ আগামীর সরকারের জন্য একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও বলেছেন, “গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। না হলে প্রশ্নগুলো থেকে যাবে।”
অবস্থাপনার এই অভাব, উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা অগ্রাহ্য করা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে অগ্রগতি না হওয়া দেশের জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল নতুন যুগের স্বচ্ছ ও জবাবদিহি ভিত্তিক উদাহরণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই সুযোগ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
পরবর্তী সরকার বা প্রশাসনের জন্য একমাত্র পথ বাকি রইল: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সম্পদ তথ্য প্রকাশ করা এবং দুর্নীতির অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা, যাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।


